Monday May 2026

হটলাইন

কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬ এ ১১:৩৭ AM

গল্প নয় সত্যি

কন্টেন্ট: পাতা

উপজেলা পর্যায়ে ২০২৫ সালে ৫টি ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ৫ জন অদম্য নারী

সুমাইয়া ইসলাম

সুমাইয়া ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নয়লাভাঙ্গা ইউনিয়নে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছোট বেলায় মা-বাবার কাছে থেকে শিখেছেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব ও সাহসিকতা। অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক জীবনের শুরু করেন এবং পরবর্তীতে সেখানে ভলান্টিয়ার হিসেবে যুক্তহন। ছোট বেলা থেকেই নিজের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষকে সাহায্য করত। সে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এখনো প্রতি মঙ্গলবার যে কোন একজন মানুষের মনের ইচ্ছা পূরণ করে যাচ্ছেন। এছাড়া যুক্ত ছিলেন বেশ কিছু স্বেচ্ছায় রক্তদান সংস্থার সাথে। স্কুল কমিটির মাধ্যমেও সহযোগিতামুলক কাজ করেন এবং কলেজে জীবনে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন। এর পাশাপাশি মাদক বিরোধী কমিটির লিডার হন ও বিডি ক্লিন এর কলেজ শাখার প্রধান হন। এসবের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও মশা নিধনে সচেতনতামূলক সেমিনার পরিচালনা করেন। বন্যার্তদের ফান্ড কালেকশন ও ত্রাণ বিতরণ করেন। কিছু সময়ের জন্য রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এ সময় ব্যাসিক এন্ড ফাস্টএইড এর ট্রেইনার হিসেবে বিভিন্ন স্কুল কলেজে প্রশিক্ষণ দিতেন। এরপর ২০২০ সালে করোনা কালীন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, মাস্ক বিতরণ ও স্যানিটাইজার ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করেন। রেড ক্রিসেন্ট পক্ষ থেকে ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করেন। ২০২১ সালে এপ্রিলে করোনা ভ্যাকসিন প্রদান শুরু হলে রেড ক্রিসেন্ট এর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ইউনিটের যুব প্রধান নিযুক্ত হয়ে ক্রাউড কন্ট্রোল ও নার্সদের কাজে সহযোগিতা করেন। তিনি ভ্যাকসিন পুশ দিতে শিখে ৫৩নং ও ৫৯নং বিজিবি ক্যাম্পে করোনা টিকা ভ্যাক্সিনেশন করতেন। ১৫০ জনের স্বেচ্ছাসেবক দল নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম শুরু করেন। সরকারি মেডিকেলসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে জীবাণু নাশক স্প্রে ও ডিস-ইনফেকশনের কাজ করেন। ২০২১ সালের মে মাসে করোনা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করলে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্যোগে ১০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ফ্রি এম্বুলেন্সে সেবার ব্যবস্থা করেন। তার টিম করোনা পজিটিভ রোগীদের বাসায় গিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও সেবা দিয়ে আসতেন। এ সময় প্রায় ৪৫০জন মানুষকে অক্সিজেন সিলিন্ডার, শতাধিক মানুষকে অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং প্রতিদিন ৩০০ মানুষকে রান্না করে খাবার বিতরণ করেছেন। এছাড়াও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা প্রদান করেন এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় এবং উত্তরবঙ্গের মধ্যে প্রথম স্থান দখল করে শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবক জাতীয় পুরস্কার পান। ২০২৩ ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স টিমের ট্রেনিং করেন। রেমাল অপারেশনে বাগেরহাটে, বন্যার্তদের সাহায্যে ২৫দিন ফেনীতে, ২০২৪-২৫ এ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করেন। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তার টিম কাজ করে। এভাবে প্রতিনিয়তই সমাজ উন্নয়নে অসমান অবদান রেখে চলেছেন এই নারী।

মাহমুদা খাতুন

মাহমুদা খাতুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের মুসলিম পুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী বাবার ৪ সন্তানের মধ্যে তিনি ৩য় ও একমাত্র মেয়ে সন্তান। যখন বাবা মারা যায় তিনি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। ভাইদের পক্ষে সংসার ও তার পড়ার খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব ছিল। নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। বিয়ের পর স্বামীও তাকে পড়াতে চাইনি। কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ির সহযোগিতা ও প্রচেষ্টায় মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ও কৃতিত্বের সাথে পাস করেন। এরপর স্বামী লেখাপড়ার খরচ দিতে অপারগতা দেখালে নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে টিউশনির খরচ দিয়ে নিজের পড়ার ব্যয় বহন করেন এবং কানসাট সোলেমান ডিগ্রী কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পাস করেন। এসময় তার প্রথম কন্যা সন্তান জন্ম হয় কিন্তু থেমে থাকেনি। এর মধ্যেই শ্বশুর-শাশুড়ি মারা যান। ভর্তি হন ডিগ্রী প্রথম বর্ষে এবং এর কিছুদিন পর স্বামী প্যারালাইস হলে গেলে কাঁধে পরে সংসারের ভার। তার যুদ্ধ শুরু হয় নিজের পড়ালেখা, সন্তান লালন-পালন ও সংসারের হাল ধরার। এরপর ২০০৫ সালে নিবন্ধন পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। বিভিন্ন সময় শিক্ষকতা করেন বাউপা স্কুল, ব্র্যাক স্কুল ও ধোবড়া মনি ক্যাডেট ইংলিশ একাডেমী বিদ্যালয়ে এবং ফ্রিতে দুস্থ ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে বাসায় পড়াতেন। এর মধ্যে বি-এড সম্পন্ন করেন এবং হোমিও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে নিবন্ধন থেকে তোহাখানা নিয়ামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় বাংলা বিষয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পান। বর্তমানে হোমিও চিকিৎসা ও স্কুলের শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত আছেন ও জীবনের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ভালো আছেন।

সুমাইয়া আক্তার বিথী

সুমাইয়া আক্তার বিথী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের গঙ্গারামপুর গ্রামে দিনমজুর বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শান্ত ও মিশুক প্রকৃতির বিথী চেয়েছিল সরকারী চাকুরী করেতে। কিন্তু অভাবের সংস্থারে মেয়ের বার বার বিয়ের কাজ আসায় এপর্যায় মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তার বিয়ে দিয়ে দেন। স্বামী নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য শ্বাশরী সবসময় তাকে গালমন্দ ও নির্যাতন করত। এসব সহ্য করতে না পেরে মায়ের বাড়ি চলে আসে। মা-বাবা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বিষয়টি সুরাহা করতে ব্যর্থ হলে আইনি পদক্ষেপে যাওয়ার কথা ভাবে। কিন্তু কাবিননামা না থাকায় তা সম্ভব হয়না। যেখানে মেয়ে নির্যাতনের স্বীকার হয়ে আত্মহত্যার মত পথ বেছে নিতে চাই সেখানে বাবা-মা আর সংসার করতে না পাঠিয়ে তালাকের সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবেই বেশ কিছু দিন কেটে যায়। এর মধ্যে বান্ধবীর মাধ্যম গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করে এফ.এস.টিপ প্রকল্পের মাধ্যমে তিন দিনের প্রশিক্ষণে জন্য মনোনীত হন। রাজশাহী হতে এ প্রশিক্ষণ গ্রহণে মানসিক সাহস ও দক্ষতা উভয় অর্জন করেন। এরপর একটি ক্লিনিকে নার্সিং এর কাজ নেন এবং গণ উন্নয়ন কেন্দ্র শিক্ষা উপকরণ দিয়ে তাকে সহযোগিতা করে। এখন তিনি জীবনের নির্যাতনের অধ্যায় সমাপ্ত করে নতুনভাবে ঘুরি দাঁড়িয়েছেন এবং লেখাপড়া শেষ করে সরকারী চাকুরী করার স্বপ্ন দেখেন। পাশাপাশি সমাজের অন্য নারীরা যেন বাল্যবিবাহ ও নির্যাতনের শিকার না হয় সেই সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন।

মোসা: খুজিস্তা আখতার

মোসা: খুজিস্তা আখতার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার নায়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের রানীহাটি গ্রামে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ৭ সন্তানের বড় পরিবারের তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ছিলেন। তার বাবার স্বল্প আয়ের অভাবী সংসার। তাই খুব কম বয়সেই একজন শিক্ষকতা পেশার ছেলে সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেন। তার স্বামী তাকে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেন। বিয়ের ছয় বছরের মাথায় পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। এর কিছু মাস পর একটি স্কুলের শিক্ষক হিসাবে তিনি যোগদান করেন। সন্তান যখন ৮ম শ্রেণীর ছাত্র তখন তার স্বামীর ক্যান্সার ধরা পরে এবং এর কয়েক মাস পার ২০০১ সালে মারা যান। স্বামীকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিন্তু সন্তানকে নিয়ে বাঁচতে হবে তাকে মানুষ করতে হবে এই ব্রত নিয়ে মনকে শক্ত করেন ও কঠিন এক পথ চলার শুরু করেন। তার অদম্য ইচ্ছা শক্তি আজ তাকে একজন সফল জননী করেছে। তার সন্তান এখন একটি ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি নিজের সন্তানই শুধু নয় সমাজের হাজার সন্তানকে গড়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন ও দায়িত্বকতার সাথে শিক্ষকতা কর যাচ্ছেন।

মোসা আঞ্জুয়ারা খাতুন

মোসা আঞ্জুয়ারা খাতুন বৈবাহিক সূত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার একজন বাসিন্দা। তিনি বাবা-মায়ের ৩মেয়ের মধ্যে বড় এবং বাবার অদম্য প্রচেষ্টায় ঢাকা BBA MBA পড়া শেষ করেন। কিন্তু বিবাহে আবদ্ধে পর করোনা কালীন শিবগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম ফিরে আসার পর বেকার স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। শহরে ফিরা প্রায় অনিশ্চিত এবং গ্রামে কি করা যায় সেই চিন্তায় করতে থাকেন। একপর্যায় ব্যবসার চিন্তা করেন। গ্রামের ৫০জন নারীকে নিয়ে নকশী কাঁথা ও হাতের কাজের পোশাক নিয়ে কাজ শুরু করেন। আমের সিজনে শহরের পরিচিত বন্ধুদের আম সরবরাহ করেন। স্বামী ই-কমার্সের মাধ্যম সারাদেশে পণ্য পাঠাতে থাকেন। আম সিজন পর চোখে আসে হাতের তৈরির পণ্য। দড়ির খাট/মাইচা- টুল এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় পোষ্ট করেন ও ভাল সারা পান। দাঁড় করেন আয়েশি ফেসবুক পেজ। অনেক অর্ডার আসা শুরু হয় ফলে নারী-পুরুষ অনেক কর্মী নিয়োগ দিয়ে কাজ শিখিয়ে শিবগঞ্জ সদরে বড় কারখানা স্থাপন করেন। আসতে আসতে ব্যবসার পরিধি বাড়ে। এখন দড়ি, সোফা, দোলনা, ডাইনিং, রকিং চেয়ার এবং আম, আমসত্ত্ব, খেজুরের গুড়, আখের গুড়, নকশী কাঁথা, হাতের কাজের জামা ইত্যাদি ই- কমার্সের মাধ্যমে বিক্রয় করেন। হার পাওয়ার প্রজেক্টের অধীন কাজ শিখেন ও নারীদের ই-কমার্সের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন ও ফ্রিল্যান্সিং এ উদ্বুদ্ধ করেন। তার ব্যবসার সাথে এখন প্রায় ১০০০ জন নারী-পুরুষ জড়িত। ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সিং হতে তার মাসিক আয় এখন এক থেকে দেড় লক্ষ টাকা। বর্তমানে তিনি একজন অর্থনৈতিকভাবে সফল একজন নারী, একজন সফল উদ্যোক্তা

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন